ধানের শীষের বিজয়ীরা শপথ নেবেন না

0

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী ধানের শীষের প্রার্থীরা শপথ নেবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। একই সঙ্গে নির্বাচনে ভোট ডাকাতি হয়েছে অভিযোগ করে ঘোষিত ফল বাতিল এবং অবিলম্বে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে দলটি। রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সোমবার দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।

এর আগে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দেড় ঘণ্টা বৈঠক করেন। সূত্র জানায়, নির্বাচনে যাওয়া না-যাওয়া এবং ভোটের আগে ও ভোটের দিন প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের ওপর হামলার পরও কেন্দ্র থেকে সঠিক নির্দেশনা না পাওয়া নিয়ে সদস্যদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা হয়।

নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত থাকা সঠিক সিদ্ধান্ত বলে একাধিক নেতা মত দেন। তারা বলেন, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার ও ইসির আসল চেহারা উন্মোচিত হয়েছে। বৈঠকে স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, অনেকে ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপির অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্তকে ভুল বলেছিল।

আমার বিশ্বাস এখন তারাই বলবে ওই নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থায়ী কমিটির এক সদস্য যুগান্তরকে বলেন, বৈঠকে ধানের শীষের বিজয়ীদের প্রসঙ্গে উঠলে তা নিয়ে সবাই কথা বলেন। সদস্যদের মধ্যে যারা নির্বাচনে অংশ নেন তারা নির্বাচনী এলাকার পরিস্থিতি তুলে ধরেন। পরে ধানের শীষের বিজয়ীদের শপথগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত হয়।

রোববার অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জোটের ৭ জন প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। এর মধ্যে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ৬ জন ও গণফোরামের উদীয়মান সূর্য প্রতীক নিয়ে একজন জয়ী হয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবহার করে সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে নজিরবিহীন ত্রাস-ভীতি সৃষ্টি করে এ নির্বাচন করা হয়েছে। এটিকে নজিরবিহীন সন্ত্রাস, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং ভোট ডাকাতি বলা যেতে পারে। আমরা এ নির্বাচনের ফল পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছি।

পুনর্ভোটের সুযোগ নেই- প্রধান নির্বাচন কমিশনারের এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির মহাসচিব বলেন, বর্তমান সিইসি সবচেয়ে পক্ষপাতদুষ্ট একজন ব্যক্তি। প্রথম থেকে তার বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে আসছিলাম। তিনি একজন দলীয় ব্যক্তি, তার সব কার্যকলাপ ইতিমধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ।

উনি যেভাবে কথা বলেন, তা সরকার যে কথা বলতে চায় সম্পূর্ণভাবে তার প্রতিধ্বনি। তিনি সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, দাবি আদায়ে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি আমাদের আন্দোলন কর্মসূচিও থাকবে। দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা করে সেটি জানিয়ে দেয়া হবে।

এ নির্বাচনে প্রমাণ হয়ে গেছে, দলীয় সরকারের অধীনে কখনো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না- এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, এ সরকার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগসাজশ করে এমন একটা নির্বাচন করল যা জাতির রাজনৈতিক ও নির্বাচনের ইতিহাসে সবচাইতে কলঙ্কজনক ঘটনা। নতুন ভোটাররা এবার সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়েছেন। তাদের অধিকার তারা প্রয়োগ করতে পারেননি। রাজধানীসহ প্রতিটি কেন্দ্র ছিল ভোটারশূন্য।

২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন সঠিক ছিল দাবি করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচন প্রমাণ করেছে- ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে না যাওয়ার যে সিদ্ধান্ত, তা সঠিক ছিল। বিএনপির এজেন্ট না এলে আমরা কি করব- সিইসির এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে ফখরুল বলেন, আর এজেন্ট না আসতে দিলে আমরা কী করব?

এজেন্ট তো আপনারা আসতে দেননি। সরকার রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ও নির্বাচন কমিশনের যোগসাজশে আমাদের এজেন্টদের কেন্দ্রে যেতেই দেয়নি। যেমন আমার নির্বাচনী এলাকায় একশ’ ভাগ এজেন্ট ছিল। কিন্তু তাদের বের করে দেয়া হয়। গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের ঢাকা-৩ আসনে একশ’ ভাগ এজেন্ট ছিল, তাদেরও বের করে দেয়া হয়েছে।

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নির্বাচনী এলাকায় এজেন্ট ছিল, তাদের বের করে দেয়া হয়েছে। এজেন্টদের বিরুদ্ধে আগে থেকে মামলা দিয়ে রেখেছে। অনেককে গ্রেফতার করেছে। নির্বাচনী এজেন্ট মনোনীত করার যে কাগজ প্রার্থী দেবে সেটা ওরা ছিঁড়ে ফেলেছে বহু জায়গায়।

তিনি বলেন, নির্বাচনটি পূর্বপরিকল্পনায় হয়েছে। আর ইঞ্জিনিয়ারিংটা করা হয়েছে ভোটের আগের রাতে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে। জনগণ যে ১০ বছর ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে পারছিল না সেটা থেকে তাদের বঞ্চিত করা হল।

ভোটের পরও বিভিন্ন স্থানে ক্ষমতাসীনরা সহিংসতা চালাচ্ছে অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, নির্বাচনের আগে সহিংসতা হয়েছে, নির্বাচনের দিন হয়েছে। এখন ভোটের পরপরই শুরু হয়েছে সহিংসতা। বিএনপি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলের প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আক্রমণ করা হচ্ছে। তাদের সমর্থকদের ওপর আক্রমণ করা হচ্ছে এবং বাড়িতে আগুন দেয়া হচ্ছে।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, অনেকে প্রশ্ন করেছেন, এত গ্রেফতার-হামলার পর আমরা কেন নির্বাচনে গেলাম। তখনও বলেছি, এখনও স্পষ্ট করে বলছি, আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী একটি রাজনৈতিক দল। আমরা নির্বাচন করতে চাই। নির্বাচন করে সরকার পরিবর্তনে বিশ্বাসী।

সে কারণে আমরা নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা নির্বাচনে গিয়েছি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য, মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনকে বারবার বলেছি, একটা পরিবেশ তৈরি করুন। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করুন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের কাছে গিয়েছি নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে। কিন্তু তারা সেটা করতে পারেনি।

তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত ২১ হাজারে বেশি নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে অভিযোগ করে অবিলম্বে তাদের মুক্তির দাবিও জানান বিএনপির মহাসচিব।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

এরপর গুলশান কার্যালয়ে ২০ দলীয় জোটের বৈঠক হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। বৈঠকে এলডিপির কর্নেল (অব.) অলি আহমদ ও জামায়াতসহ বিভিন্ন শরিক দলের নেতারা ছিলেন।৥যুগান্তর

Comment

Share.

Leave A Reply