বিশ্বাসীদের অনুপ্রেরণা হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.

0

ওয়ালিউল্লাহ আরমান ::

সততা, জবাবদিহিতা, ন্যায়পরায়ণতা, কোমলতা ও দয়াদ্রতার পাশাপাশি সাহসিকতা এবং আপোষহীনতার চিরভাস্বর উপমা।

হযরত রাসূলুল্লাহ সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সবচেয়ে কাছের বন্ধু ও সহচর হলেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.।

‘সিদ্দীকে আকবর’, ‘আবু বকর’ হিসেবে পরিচিতি বেশী হলেও তাঁর প্রকৃত নাম আবদুল্লাহ।

সদ্ব্যবহার, অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও মাধুর্য, ব্যবসায়িক সততা, যোগ্যতা ও দক্ষতার কারণে সমগ্র মক্কায় তাঁর যশ ও খ্যাতি ছিল।

বাণিজ্যিক দক্ষতা, বিশ্বস্ততা ও ন্যায়পরায়ণতার কারণে কুরাইশ সর্দাররা পর্যন্ত আবু বকর রা.কে সম্মানের চোখে দেখতো এবং যেকোন গোত্রীয় ও সামাজিক কার্যকলাপে তাঁর উপস্থিতি অপরিহার্য বলে গণ্য হতো।

আইয়ামে জাহিলিয়াতে সকলেই কম বেশী পাপাচারে লিপ্ত থাকলেও যে কজন পুণ্যাত্মা ঐসব পাপাচারকে ঘৃণা করতো আবু বকর রা. তাদের একজন।

কেউ তাকে মধ্যপানের জন্য আহবান করলে তিনি বলতেন, “এ সকল কাজকে আমি নিজের জন্য অবমাননাকর এবং অসম্মানজনক বলে মনে করি; সুতরাং এ সকল কাজে আমি অংশগ্রহণ করব এমনটা আপনারা কখনও আশা করবেন না।”

বলা হয়ে থাকে ‘রতনে রতন চিনে।’ তাই নবুওয়াতের আগে থেকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে আবু বকর রা. এর অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব ছিল। তাদের বন্ধুত্ব এত প্রগাঢ় ছিল যে, ব্যবসার কারণে বা অন্য কোন কারণে মক্কার বাইরে গেলেও তারা একসাথে যেতেন।

ইসলামের আগমনের সাথে সাথেই আবু বকর রা. ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আমি যার কাছেই ইসলাম পেশ করেছি, সেই ইসলাম গ্রহণের পূর্বে নিজে নিজে বিবেচনা করেছে, একটু চিন্তিত হয়েছে কিংবা আমার নবুওয়াতের প্রমাণ চেয়েছে। কিন্তু আবু বকরকে ইসলাম পেশ করার সঙ্গে সঙ্গে নিঃসংকোচে সে ইসলাম গ্রহণ করেছে।”

ইসলাম গ্রহণ করে তিনি দাওয়াতি কাজে লেগে পড়েন। তার দাওয়াতে একে একে হযরত উসমান রা. হযরত যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা. হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. হযরত আব্দুর রাহমান ইবনে আউফ রা.সহ আরো অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করেন।

শুধু তাই নয় ঈমানের ঘোষণা দিয়ে মক্কার নাজুক পরিস্থিতিতেও তিনি প্রকাশ্যে নামাজ আদায় ও কুরআন পাঠ করতেন। এছাড়াও ঈমান এনে মুশরিকদের অত্যাচারে নিষ্পেষিত হওয়া গোলামদের আযাদ করার কাজে তিনি নিজ সম্পদ অকাতরে বিলিয়ে দিতেন।

হযরত বিলাল রা. হযরত হিন্দিয়া রা. হযরত জারিয়া রা. প্রমুখ মুসলিমদের তিনি তাদের মালিকের কাছ থেকে কিনে আযাদ করেছিলেন।

যখন মিরাজের ঘটনা ঘটল তখন অনেকেই তা অবিশ্বাস করল। কাফেররা হাসি তামাশা শুরু করে দিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মুখে শোনার আগেই রাস্তায় আবু জেহেল মিরাজ নিয়ে ব্যঙ্গ করছিল তখন আবু বকর রা. বললেন, “যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনটা বলে থাকেন তাহলে তিনি ঠিকই বলেছেন। আমি তার প্রতিটি অক্ষরের সত্যতা স্বীকার করি। শুধু তাই নয় এর চেয়েও দূরের কোন পথ অতিক্রম করা আর আসমানি সংবাদ আসার সত্যতা আমি অক্ষরে অক্ষরে বিশ্বাস করি।” এ খবর শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকরকে ‘সিদ্দীক’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

মক্কার মুসলিমরা দলে দলে হিজরত শুরু করলে আবু বকর রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে হিজরতের অনুমতি চাইলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন, “তাড়াহুড়া করো না। আল্লাহ হয়তো তোমার জন্য একজন সহযাত্রী জুটিয়ে দিবেন।” একথা শুনে আবু বকর ভাবলেন, রাসূলুল্লাহ হয়তো নিজের কথাই বলেছেন। তাই তিনি দুটি উট কিনে যত্ন সহকারে পুষতে থাকেন যাতে হিজরতের সময় কাজে লাগে।

উম্মুল মুনিনীন হযরত আয়শা রা. বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়, একদিন হযরত রাসূলুল্লাহ হযরত আবু বকরের বাড়িতে এসে জানালেন, তাঁকে হিজরতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
আবু বকর জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি কি সঙ্গে যেতে পারব?” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “হ্যাঁ যেতে পারবে।”
মা আয়শা বলেন, “সেদিনের আগে আমি জানতাম না যে, মানুষ আনন্দের আতিশয্যে এত কাঁদতে পারে। আমি আমার পিতাকে সেদিন কাঁদতে দেখেছি।”

হযরত আবু বকরকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনার পথে রওনা করলেন। ওদিকে কাফের কুরাইশরা তাঁদের পিছু ধাওয়া করল। তারা সওর গুহায় আশ্রয় নিলেন। গুহার বাইরে শত্রুর উপস্থিতি টের পেয়ে আবু বকর ভীষণ দুর্ভাবনায় পড়লেন।

মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতকালীন দীর্ঘ সফরের বিবরণ আমাদের সবার জানা। এ বরকতপূর্ণ ঐতিহাসিক সফর প্রসঙ্গে আলোচনায় কোরআনে কারীমে হযরত আবু বকর এর প্রতি শারে করে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আয়াতও নাযিল করেছেন।

হযরত উমর রা. এর আমলে একবার এক মজলিশে আলোচনা হচ্ছিল হযরত আবু বকর রা. নাকি উমর রাযিয়াল্লাহু. মর্যাদায় কে সেরা?
সেই মাজলিশে উমর রা. বলেছিলেন, “যদি আমার সারাজীবনের নেকআমল আবু বকর রা. এর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে কাটানো সেই কয়েক মুহূর্তের সমান হতো তাহলে কতই যে ভালো হত!”

বদর যুদ্ধে আবু বকর রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাহারা দিয়েছেন আবার ময়দানে গিয়ে যুদ্ধও করেছেন। একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাঁধ থেকে চাদর পড়ে যাচ্ছে দেখে আবু বকর রা. যুদ্ধের ময়দান থেকে দৌঁড়ে এসে চাদর ঠিক করে আবার যুদ্ধের ময়দানে ছুটে গেলেন।

একবার তার ছেলে আব্দুর রহমান (তখন পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেননি) যুদ্ধে তার সামনে আসল, কিন্তু পিতাকে দেখে তরবারি নত করে অন্যদিকে চলে গেলেন। কথা প্রসঙ্গে একবার তিনি পিতা আবু বকর রা. কে বললেন, “বদর যুদ্ধে আপনি আমার তরবারির নিচে এসেছিলেন। কিন্তু আমি স্বেচ্ছায় কিছু করি নাই, অন্যত্র চলে গিয়েছিলাম” এর উত্তরে আবু বকর রা. বলেন, “আল্লাহর কসম! আমি তোমাকে লক্ষ্য করিনি, নয়তো জীবিত ছাড়তাম না।”

হিজরি নবম সালে কাইসারে রোম মুসলমানদের উপর আক্রমণ চালাবে এমন সংবাদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলিমদের উদ্দেশ্যে বললেন, “জেহাদের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ কর এবং যার যতটুকু সামর্থ্য আছে আল্লাহর রাস্তায় দান কর।” এই আহবানে সাড়া দিয়ে আবু বকর রা. নিজের সমস্ত সম্পদই দান করলেন। দ্বীনের জন্য এই ত্যাগ দেখে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, “পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছো?” জবাবে হযরত আবু বকর রা. বলেছিলেন, “তাদের জন্য আল্লাহ এবং তার রাসূলের মহব্বতই যথেষ্ট।”

বিদায় হজ্জে আবু বকর রা.ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ছিলেন। হজ্জ শেষে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “হে আমার উম্মতগণ! আল্লাহপাক নিজের একজন বান্দাকে দুনিয়া এবং আখেরাতের কোন একটা পছন্দ করার জন্য এখতিয়ার দিয়েছিলেন, ঐ বান্দা দুনিয়া ছেড়ে আখেরাত পছন্দ করেছে।” অন্য কেউ এই কথার অর্থ বুঝতে সক্ষম না হলেও আবু বকর রা. ঠিকই বুঝতে পেরে অঝোরে কান্না শুরু করে দিলেন।

রাসূলুল্লাহ সা. এর মৃত্যুর পর মুসলিমরা ধৈর্যহারা হয়ে পড়ল। উমর রা. খোলা তরবারি নিয়ে ছুটাছুটি শুরু করলেন যেন সবকিছু শেষ করে দেবেন। হযরত আবু বকর বেরিয়ে এসে হযরত উমরকে বসতে বললে উমর বসতে অস্বীকার করলেন। তখন আবু বকর বললেন, “অতঃপর আপনাদের মধ্যে যারা মুহম্মদের ইবাদত করতেন, তিনি তো ইন্তেকাল করেছেন। আর যারা আপনাদের মধ্যে আল্লাহর ইবাদত করতেন জেনে রাখুন, আল্লাহ চিরঞ্জীব, কখনো মরবেন না। এরপর আবু বকর রা. মুসলিমদের লক্ষ্য করে কুরানের এই আয়াতটি তেলওয়াত করেন; “আর মুহাম্মদ কেবল একজন রাসূল। তাঁর পূর্বেও নিশ্চয়ই অনেক রাসূল বিগত হয়েছে। যদি সে মারা যায় অথবা তাঁকে হত্যা করা হয়, তবে তোমরা কি তোমাদের পেছনে ফিরে যাবে? আর যে ব্যক্তি পেছনে ফিরে যায়, সে কখনো আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারে না। আর আল্লাহ অচিরেই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবেন।” [সূরা আলে ইমরানঃ ১৪৪]

এই আয়াত শুনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, “আল্লাহর কসম! আবু বকর রা. এর পাঠ করার পূর্বে লোকেরা যেন জানত না যে, আল্লাহ তায়ালা এরুপ আয়াত অবতীর্ণ করেছেন!”
আবেগ তাদের এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে, তারা এই বিষয়ে আল্লাহর আয়াতের কথাও ভুলে গিয়েছিল।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওফাতের পর সবার সর্বস্মমতিক্রমে আবু বকর রা. খলীফা নির্বাচিত হবার পর প্রথম ভাষণে বলেন, “হে জনমণ্ডলী! আমাকে আপনাদের নেতা নির্বাচিত করা হয়েছে, অথচ আমি আপনাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম নই। যাই হোক, আমি ভালো কাজ করলে আপনারা আমাকে সাহায্য করবেন। আর অন্যায় পথ অবলম্বন করলে আপনারা আমাকে সংশোধন কর দিবেন। মনে রাখবেন, সততা একটি আমানতস্বরূপ আর মিথ্যা তার খেয়ানত।
ইনশাআল্লাহ! আপনাদের মধ্যে দুর্বলজন আমার কাছে সবল বলে বিবেচিত হবে যতক্ষণ না আমি তার ন্যায্য অধিকার তাকে প্রদান করতে পারি। আর আপনাদের সবলও আমার কাছে দুর্বল বলে বিবেচিত হবে যতক্ষণ না আমি তার কাছ থেকে অপরের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারি।
হে জনসাধারণ! জিহাদকে অবহেলা করবে না। আল্লাহর রাহে জিহাদ থেকে যে জাতি বিরত থাকে, আল্লাহপাক সেই জাতিকে লাঞ্ছিত ও পর্যুদস্ত করে দেন এবং তাদের ভাগ্য বিপর্যয় ঘটে। আর যে জাতির মধ্যে কুকর্ম এবং অনাচার ব্যাপক আকার ধারণ করে, আল্লাহপাক সেই জাতির মধ্যে বিপদাপদও ব্যাপক করে দেন।
যতক্ষণ পর্যন্ত আমি আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ এর অনুগত থেকে তাদের প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে চলব, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনারা আমার অনুসরণ করবেন। আর যদি আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য অস্বীকার করি, তবে আপনারাও আমার অনুসরণ করবেন না। কারণ তখন আপনাদের উপর আমার অনুসরণ আর ফরয থাকবে না। এখন নামাযের সময় হয়েছে। অতএব, নামাযের জন্য সকলে তৈয়ার হউন। আল্লাহপাক আপনাদের উপর রহমত বর্ষণ করুন।”

সুবাহানাল্লাহ! আল্লাহু আকবর। দুনিয়ার সব নেতার এই ছোট্ট ভাষণ থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।

আবু বকর রা. এর খেলাফতকালে চারদিকে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। মুসাইলামা কাযযাবসহ আরো অনেকেই মিথ্যা নবুওয়াতের দাবি করে। অনেকে মুর্তাদ হয়ে যায়। মুনাফিকরা নড়ে চড়ে বসে। অনেকেই যাকাত দিতে অস্বীকার করে। আবু বকর রা. বেশ সাহসিকতার সাথে সবকিছু মোকাবেলার মাধ্যমে বিদ্রোহী, মুরতাদ এবং মিথ্যা দাবীদার নবীদের প্রতিহত করেন।

হযরত আবু বকর রা. এর চরিত্রে কোমলতা আর কঠোরতার বিরর সমন্বয় ঘটেছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওফাতের আগে উসামা বিন যায়েদ রা. এর নেতৃত্বে একটি বাহিনীকে শাম দেশ আক্রমণ করতে পাঠান। উসামার বাহিনী মদীনা ত্যাগের আগেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করেন।
এরপর অনেকে আবু বকর রা.কে উসামার বাহিনীকে ফেরত আনার পক্ষে মত দেন। হযরত উমর রা. এর মত বজ্রকঠোর মানুষটি পর্যন্ত বলেন, “হে খলিফাতুল মুসলিমীন! এখন জোরজবরদস্তির সময় নয়, যতদূর সম্ভব নম্রতা দেখিয়ে অন্তর জয় করার সময়।”

জবাবে হযরত আবু বকর রা. বলেছিলেন, “উমর! ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তুমি কঠোর প্রকৃতির ছিলে। ইসলাম গ্রহণের পর এতই নম্র হয়ে গেলে? মনে রেখো, ইসলাম সম্পূর্ণ হয়েছে এবং আলাহর ওহী বন্ধ হয়ে গেছে। আমার জীবদ্দশায় ইসলাম পঙ্গু হয়ে যাবে এটা আমি কোনমতেই সহ্য করব না। আল্লাহর কসম! আমার গোশত যদি পশুপক্ষীরাও খেয়ে ফেলে, তবুও আমি সেই বাহিনীকে নিশ্চয়ই প্রেরণ করব, যাদেরকে রওনা দেওয়ার জন্য স্বয়ং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন।”

উসামার বাহিনী রওনা হওয়ার সময় আবু বকর রা. উসামা বিন যায়েদ রা.কে উপদেশ দিতে দিতে ঘোড়ার সঙ্গে সঙ্গে পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। উসামা রা. আরয করলেন, “হে খলীফাতুল মুসলিমীন! আপনি পায়ে হেঁটে আমাকে লজ্জিত করবেন না। আপনিও সওয়ারিতে আরোহণ করুন, নইলে আমি নীচে নেমে আসব।”
জবাবে তিনি উসামা রা.কে ঘোড়ায় বসে থাকার আদেশ দিয়ে বলেছিলেন, “আল্লাহর রাস্তায় কিছুদূর পর্যন্ত আমার পায়েও ধুলোবালি লাগতে দাও। কেননা, গাযীদের প্রত্যেক কদমে সাত শত নেকী লেখা হয়।”

হযরত আবু বকর রা. এর আমলে অনেকে যাকাত দিতে অস্বীকার করে। অনেকে আবু বকর রা. এর কাছে বিভিন্ন অজুহাত আর দাবিদাওয়া পেশ করল। আবু বকর রা. রাগান্বিত হয়ে বলেন, “দুনিয়ার বুকে এমন ক্ষমতা কারো নেই যে, ইসলামের আহকামের এক ধূলিকণা পরিমাণও পবিবর্তন-পরিবর্ধন করতে পারে। আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আমলে যদি কেউ একটি ছাগলের বাচ্চাও যাকাত দিত; কিন্তু এখন সে দিতে না চায়, তাহলে আমি আবু বকর তার বিরুদ্ধে জিহাদ করব।”

আবু বকর রা. অনেক সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও সবকিছু আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে হতদরিদ্র এবং সাধারণ জীবনযাপন করতেন।
একবার হযরত আবু বকর রা. এর স্ত্রীর মিষ্টি খাওয়ার খুব ইচ্ছে হল। তিনি স্বামীকে মিষ্টি কিনে আনতে বললেন। সারা মুসলিম জাহানের আমীর আবু বকর জানালেন তার মিষ্টি কেনার সামর্থ নেই। আমীরুল মুমিনীনের স্ত্রী এরপর প্রত্যেক দিনের খরচ বাঁচিয়ে অর্থ জমা করা শুরু করলেন। কিছু অর্থ জমা হওয়ার পর তা স্বামীকে দিয়ে বললেন মিষ্টি কিনে আনতে।
হযরত আবু বকর জিজ্ঞেস করলেন, এই অর্থ কোথা থেকে এসেছে? স্ত্রী বললেন প্রতিদিনের খরচ থেকে বাঁচিয়ে তিনি এই অর্থ জমা করেছেন। আবুবকর রা. তখন বললেন, এই পরিমাণ অর্থ তাহলে আমি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অতিরিক্ত নিচ্ছি?এটার তো তাহলে আমার আর দরকার নেই! এরপর তিনি সেই অর্থ স্ত্রীর জন্য মিষ্টি কেনার বদলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়ে আসেন।

উমার রা.কে খলীফা নির্বাচিত করে আবু বকর রাঃ. তখন মৃত্যুশয্যায়। আয়েশা রা.কে বললেন, “আমার কাছে বাইতুল মালের একটি বাঁদি আর একটি উট আছে। আমার মৃত্যুর পর ওগুলো উমরের কাছে পাঠিয়ে দিও। এছাড়াও অন্য কিছু থাকলে তাও পাঠিয়ে দিও। আর আমি যে পোশাক পরিধান করেছি, তা ধুয়ে আমার কাফন দিও।”
হযরত আয়েশা রা. বললেন, “এগুলো তো পুরাতন কাপড়।” তিনি বললেন, “কোন অসুবিধা নেই। কারণ মৃতের চাইতে জীবিতদের জন্যই নতুন কাপড়ের প্রয়োজন অধিক। আমার জন্য এটাই যথেষ্ট।”
মৃত্যুর সময়ও তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথা ভুলেননি। জিজ্ঞেস করলেন, “আজ কি বার?”
উত্তর দেওয়া হল, “সোমবার।”
আবার জিজ্ঞেস করলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওফাত কোনদিনে হয়েছিল?”
উত্তর দেওয়া হল, “সোমবার।”
আবু বকর রা. বললেন, “আমিও সেটাই আশা রাখি যে, আজ সন্ধ্যার মধ্যে যেন এই ইহকাল ত্যাগ করতে পারি।”

সুবাহানাল্লাহ! আল্লাহু আকবর! আল্লাহ আবু বকর রা. নামের অসাধারণ মানুষটির উপর রহম করুন। এই আমাদের আবু বকর রা.। যিনি সর্বপ্রথম ইসলামের আহবানে সাড়া দেন, যিনি সওর গুহায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথী ছিলেন এবং সারাটা জীবন ইসলামের খেদমতে অতিবাহিত করেছেন। সোমবার দিবাগত রাতে ইহকাল ছেড়ে স্বীয় প্রভুর সাথে মিলিত হন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

আবু বকর রা. ছিলেন এমন মহাসৌভাগ্যবানদের একজন, যিনি দুনিয়াতে থাকতেই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত হন। এরপরও তাক্বওয়া আর ঈমানের মাপকাটিতে তিনি ছিলেন অনন্য। এমন একজন মানুষ যিনি সালাতে দাঁড়িয়ে এত অঝোরে কাঁদতেন যে, পেছনের মুসল্লিরা তাঁর কুরআনের তেলাওয়াত বুঝতে পারতেন না। এমন একজন মানুষ, যিনি খুব সকালে উঠে মরুভূমির বুকে এক বৃদ্ধার বাড়ি ধোয়ামোছা করে দিতেন। আবার সেই মানুষটিই ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে ছিলেন বজ্রকঠোর।

ইসলামের ইতিহাসে আবু বকররা বারবার জন্ম নেয় না। আলাহ আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথী, প্রথম খলীফা, আশারায়ে মোবাশশার একজন এই অসাধারণ মানুষটির জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার তৌফীক দিন। আমীন।

Comment

Share.

Leave A Reply